Thursday, September 29, 2016

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-১০)

শেষের কবিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-১০)
-
অমিত যোগমায়ার কাছে এসে বললে, "মাসিমা, ঘটকালি করতে
এলেম। বিদায়ের বেলা কৃপণতা করবেন না।"

"পছন্দ হলে তবে তো। আগে নাম-ধাম-বিবরণটা বলো।"

অমিত বললে, "নাম নিয়ে পাত্রটির দাম নয়।"

"তা হলে ঘটক-বিদায়ের হিসাব থেকে কিছু বাদ পড়বে দেখছি।"

"অন্যায় কথা বললেন। নাম যার বড়ো তার সংসারটা ঘরে অল্প,
বাইরেই বেশি। ঘরের মন-রক্ষার চেয়ে বাইরে মান-রক্ষাতেই তার
যত সময় যায়। মানুষটার অতি অল্প অংশই পড়ে স্ত্রী ভাগে,
পুরো বিবাহের পক্ষে সেটুকু যথেষ্ট নয়। নামজাদা মানুষের বিবাহ
স্বল্পবিবাহ, বহুবিবাহের মতোই গর্হিত।"

"আচ্ছা, নামটা নাহয় খাটো হল, রূপটা?"

"বলতে ইচ্ছে করি নে, পাছে অত্যুক্তি করে বসি।"

"অত্যুক্তির জোরেই বুঝি বাজারে চালাতে হবে?"

"পাত্র-বাছাইয়ের বেলায় দুটি জিনিস লক্ষ করা চাই-- নামের
দ্বারা বর যেন ঘরকে ছাড়িয়ে না যায়, আর রূপের দ্বারা কনেকে।"

"আচ্ছা নামরূপ থাক্, বাকিটা?"

"বাকি যেটা রইল সব-জড়িয়ে সেটাকে বলে পদার্থ। তা লোকটা
অপদার্থ নয়।"

"বুদ্ধি?"

"লোকে যাতে ওকে বুদ্ধিমান বলে হঠাৎ ভ্রম করে সেটুকু বুদ্ধি
ওর আছে।"

"বিদ্যে?"

"স্বয়ং নিউটনের মতো। ও জানে যে, জ্ঞানসমুদ্রের কূলে সে
নুড়ি কুড়িয়েছে মাত্র। তাঁর মতো সাহস করে বলতে পারে না,
পাছে লোকে ফস করে বিশ্বাস করে বসে।"

"পাত্রের যোগ্যতার ফর্দটা তো দেখছি কিছু খাটো গোছের।"

"অন্নপূর্ণার পূর্ণতা প্রকাশ করতে হবে বলেই শিব নিজেকে
ভিখারি কবুল করেন, একটুও লজ্জা নেই।"

"তা হলে পরিচয়টা আরো একটু স্পষ্ট করো।"

"জানা ঘর। পাত্রটির নাম অমিতকুমার রায়। হাসছেন কেন
মাসিমা। ভাবছেন কথাটা ঠাট্টা?"

"সে ভয় মনে আছে বাবা, পাছে শেষ পর্যন্ত ঠাট্টাই হয়ে ওঠে।"

"এ সন্দেহটা পাত্রের 'পরে দোষারোপ।"

"বাবা, সংসারটাকে হেসে হালকা করে রাখা কম ক্ষমতা নয়।"

"মাসি, দেবতাদের সেই ক্ষমতা আছে, তাই দেবতারা বিবাহের
অযোগ্য, দময়ন্তী সে কথা বুঝেছিলেন।"

"আমার লাবণ্যকে সত্যি কি তোমার পছন্দ হয়েছে।"

"কিরকম পরীক্ষা চান, বলুন।"

"একমাত্র পরীক্ষা হচ্ছে, লাবণ্য যে তোমার হাতেই আছে এইটি
তোমার নিশ্চিত জানা।"

"কথাটাকে আর-একটু ব্যাখ্যা করুন।"

"যে রত্নকে সস্তায় পাওয়া গেল তারও আসল মূল্য যে বোঝে
সেই জানব জহুরি।"

"মাসিমা, কথাটাকে বড়ো বেশি সূক্ষ্ম করে তুলছেন। মনে হচ্ছে,
যেন একটা ছোটো গল্পের সাইকোলজিতে শান লাগিয়েছেন।
কিন্তু কথাটা আসলে যথেষ্ট মোটা--

জাগতিক নিয়মে এক
ভদ্রলোক এক ভদ্ররমণীকে বিয়ে করবার জন্যে খেপেছে। দোষে
গুণে ছেলেটি চলনসই, মেয়েটির কথা বলা বাহুল্য। এমন অবস্থায়
সাধারণ মাসিমার দল স্বভাবের নিয়মেই খুশি হয়ে তখনই
ঢেঁকিতে আনন্দনাড়ু কুটতে শুরু করেন।"

"ভয় নেই বাবা, ঢেঁকিতে পা পড়েছে। ধরেই নাও, লাবণ্যকে তুমি
পেয়েইছ। তার পরেও, হাতে পেয়েও যদি তোমার পাবার ইচ্ছে
প্রবল থেকেই যায় তবেই বুঝব, লাবণ্যর মতো মেয়েকে বিয়ে
করবার তুমি যোগ্য।"

"আমি যে এ-হেন আধুনিক, আমাকে সুদ্ধ তাক লাগিয়ে দিলেন।"

"আধুনিকের লক্ষণটা কী দেখলে।"

"দেখছি, বিংশ শতাব্দীর মাসিমারা বিয়ে দিতেও ভয় পান।"

"তার কারণ, আগেকার শতাব্দীর মাসিমারা যাদের বিয়ে দিতেন
তারা ছিল খেলার পুতুল। এখন যারা বিয়ের উমেদার, মাসিমাদের
খেলার শখ মেটাবার দিকে তাদের মন নেই।"

"ভয় নেই আপনার। পেয়ে পাওয়া ফুরোয় না, বরঞ্চ চাওয়া বেড়েই
ওঠে, লাবণ্যকে বিয়ে করে এই তত্ত্ব প্রমাণ করবে বলেই অমিত
রায় মর্তে অবতীর্ণ। নইলে আমার মোটরগাড়িটা অচেতন পদার্থ
হয়েও অস্থানে অসময়ে এমন অদ্ভুত অঘটন ঘটিয়ে বসবে কেন।"

"বাবা, বিবাহযোগ্য বয়সের সুর এখনো তোমার কথাবার্তায়
লাগছে না, শেষে সমস্তটা বাল্যবিবাহ হয়ে না দাঁড়ায়।"

"মাসিমা, আমার মনের স্বকীয় একটা স্পেসিফিক গ্রাভিটি
আছে, তারই গুণে আমার হৃদয়ের ভারী কথাগুলোও মুখে খুব
হালকা হয়ে ভেসে ওঠে, তাই বলে তার ওজন কমে না।"

যোগমায়া গেলেন ভোজের ব্যবস্থা করতে। অমিত এ-ঘরে ও-ঘরে
ঘুরে বেড়ালে, দর্শনীয় কাউকে দেখতে পেলে না। দেখা হল
যতিশংকরের সঙ্গে। মনে পড়ল, আজ তাকে অ্যাণ্টনি
ক্লিয়োপ্যাট্রা পড়াবার কথা। অমিতর মুখের ভাব দেখেই যতি
বুঝেছিল, জীবের প্রতি দয়া করেই আজ তার ছুটি নেওয়া আশু
কর্তব্য। সে বললে, "অমিতদা, কিছু যদি মনে না কর, আজ আমি
ছুটি চাই, আপার শিলঙে বেড়াতে যাব।"

অমিত পুলকিত হয়ে বললে,
"পড়ার সময় যারা ছুটি নিতে জানে
না তারা পড়ে, পড়া হজম করে না। তুমি ছুটি চাইলে আমি কিছু
মনে করব এমন অসম্ভব ভয় করছ কেন।"

"কাল রবিবার ছুটি তো আছেই, পাছে তুমি তাই ভাব--"

"ইস্কুলমাস্টারি বুদ্ধি আমার নয় ভাই, বরাদ্দ ছুটিকে ছুটি বলিই
নে। যে ছুটি নিয়মিত তাকে ভোগ করা, আর বাঁধা পশুকে শিকার
করা, একই কথা। ওতে ছুটির রস ফিকে হয়ে যায়।"

হঠাৎ যে উৎসাহে অমিতকুমার ছুটিতত্ত্ব-ব্যাখ্যায় মেতে উঠল
তার মূল কারণটা অনুমান করে যতির খুব মজা লাগল। সে বললে,
"কয়দিন থেকে ছুটিতত্ত্ব সম্বন্ধে তোমার মাথায় নতুন নতুন
ভাব উঠছে। সেদিনও আমাকে উপদেশ দিয়েছিলে। এমন আর
কিছুদিন চললেই ছুটি নিতে আমার হাত পেকে যাবে।"

"সেদিন কী উপদেশ দিয়েছিলুম।"

"বলেছিলে, "অকর্তব্যবুদ্ধি মানুষের একটা মহদ্গুণ। তার ডাক
পড়লেই একটুও বিলম্ব করা উচিত হয় না।' বলেই বই বন্ধ করে
তখনই বাইরে দিলে ছুট। বাইরে হয়তো একটা অকর্তব্যের
কোথাও আবির্ভাব হয়েছিল, লক্ষ করি নি।"

যতির বয়স বিশের কোঠায়। অমিতর মনে যে চাঞ্চল্য উঠেছে ওর
নিজের মনেও তার আন্দোলনটা এসে লাগছে। ও লাবণ্যকে
এতদিন শিক্ষকজাতীয় বলেই ঠাউরেছিল, আজ অমিতর
অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছে সে নারীজাতীয়।

অমিত হেসে বললে, "কাজ উপস্থিত হলেই প্রস্তুত হওয়া চাই,
এ উপদেশের বাজারদর বেশি, আক্ব্বরি মোহরের মতো; কিন্তু
ওর উলটো পিঠে খোদাই থাকা উচিত, অকাজ উপস্থিত হলেই
সেটাকে বীরের মতো মেনে নেওয়া চাই।"

"তেমার বীরত্বের পরিচয় আজকাল প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে।"

যতির পিঠ চাপড়িয়ে অমিত বললে, "জরুরি কাজটাকে এক কোপে
বলি দেবার পবিত্র অষ্টমী তিথি তোমার জীবনপঞ্জিকায়
একদিন যখন আসবে দেবীপূজায় বিলম্ব কোরো না ভাই, তার
পরে বিজয়াদশমী আসতে দেরি হয় না।"

যতি গেল চলে, অকর্তব্যবুদ্ধিও সজাগ, যাকে আশ্রয় করে অকাজ
দেখা দেয় তারও দেখা নেই। অমিত ঘর ছেড়ে গেল বাইরে।

ফুলে আচ্ছন্ন গোলাপের লতা, এক ধারে সূর্যমুখীর ভিড়, আর-
এক ধারে চৌকো কাঠের টবে চন্দ্রমল্লিকা। ঢালু ঘাসের খেতের
উপরপ্রান্তে এক মস্ত য়ুক্যালিপ্টস গাছ। তারই গুঁড়িতে হেলান
দিয়ে সামনে পা ছড়িয়ে বসে আছে লাবণ্য। ছাই রঙের আলোয়ান
গায়ে, পায়ের উপর পড়েছে সকালবেলার রোদ্দুর। কোলে রুমালের
উপর কিছু রুটির টুকরো, কিছু ভাঙা আখরোট। আজ সকালটা
জীবসেবায় কাটাবে ঠাউরেছিল, তাও গেছে ভুলে। অমিত কাছে
এসে দাঁড়াল, লাবণ্য মাথা তুলে তার মুখের দিকে চেয়ে চুপ করে
রইল, মৃদু হাসিতে মুখ গেল ছেয়ে। অমিত সামনাসামনি বসে
বললে, "সুখবর আছে। মাসিমার মত পেয়েছি।"

লাবণ্য তার কোনো উত্তর না করে অদূরে একটা নিষ্ফলা
পিচগাছের দিকে একটা ভাঙা আখরোট ফেলে দিলে। দেখতে
দেখতে তার গুঁড়ি বেয়ে একটা কাঠবিড়ালি নেমে এল। এই জীবটি
লাবণ্যর মুষ্টিভিখারিদলের একজন।

অমিত বললে, "যদি আপত্তি না কর তোমার নামটা একটু ছেঁটে
দেব।"

"তা দাও।"

"তোমাকে ডাকব বন্য বলে।"

"বন্য!"

"না না, এ নামটাতে হয়তো-বা তোমার বদনাম হল। এরকম নাম
আমাকেই সাজে। তোমাকে ডাকব-- বন্যা। কী বল।"

"তাই ডেকো, কিন্তু তোমার মাসিমার কাছে নয়।"

"কিছুতেই নয়। এ-সব নাম বীজমন্ত্রের মতো, কারো কাছে
ফাঁস করতে নেই। এ রইল আমার মুখে আর তোমার কানে।"

"আচ্ছা বেশ।"

"আমারও ঐ রকমের একটা বেসরকারি নাম চাই তো। ভাবছি
"ব্রহ্মপুত্র' কেমন হয়। বন্যা হঠাৎ এল তারই কূল ভাসিয়ে
দিয়ে।"

"নামটা সর্বদা ডাকবার পক্ষে ওজনে ভারী।"

"ঠিক বলেছ। কুলি ডাকতে হবে ডাকবার জন্যে। তুমিই তা হলে
নামটা দাও। সেটা হবে তোমারই সৃষ্টি।"

"আচ্ছা, আমিও দেব তোমার নাম ছেঁটে। তোমাকে বলব মিতা।"

"চমৎকার! পদাবলীতে ওরই একটি দোসর আছে-- বঁধু। বন্যা, মনে
ভাবছি, ঐ নামে নাহয় আমাকে সবার সামনেই ডাকলে, তাতে
দোষ কী।"

"ভয় হয়, এক কানের ধন পাঁচ কানে পাছে সস্তা হয়ে যায়।"

"সে কথা মিছে নয়। দুইয়ের কানে যেটা এক, পাঁচের কানে সেটা
ভগ্নাংশ। বন্যা!"

"কী মিতা।"

"তোমার নামে যদি কবিতা লিখি তো কোন্ মিলটা লাগাব
জান?-- অনন্যা!"

"তাতে কী বোঝাবে।"

"বোঝাবে, তুমি যা তুমি তাই-ই, তুমি আর কিছুই নও।"

"সেটা বিশেষ আশ্চর্যের কথা নয়।"

"বল কী, খুবই আশ্চর্যের কথা। দৈবাৎ এক-একজন মানুষকে
দেখতে পাওয়া যায় যাকে দেখেই চমকে বলে উঠি, এ মানুষটি
একেবারে নিজের মতো, পাঁচজনের মতো নয়। সেই কথাটি আমি
কবিতায় বলব--
হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।"

"তুমি কবিতা লিখবে নাকি।"

"নিশ্চয়ই লিখব। কার সাধ্য রোধে তার গতি।"

"এমন মরিয়া হয়ে উঠলে কেন।"

"কারণ বলি। কাল রাত্তির আড়াইটা পর্যন্ত, ঘুম না হলে যেমন
এ-পাশ ও-পাশ করতে হয় তেমনি করেই, কেবলই অক্স্ফোর্ড্
বুক অফ ভার্সেস-এর এ-পাত ও-পাত উলটেছি। ভালোবাসার
কবিতা খুঁজেই পেলুম না, আগে সেগুলো পায়ে পায়ে ঠেকত।
স্পষ্টই বুঝতে পারছি, আমি লিখব বলেই সমস্ত পৃথিবী আজ
অপেক্ষা করে আছে।"

এই বলেই লাবণ্যর বাঁ হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে
বললে, "হাত জোড়া পড়ল, কলম ধরব কী দিয়ে। সব চেয়ে
ভালো মিল হাতে হাতে মিল। এই-যে তোমার আঙুলগুলি আমার
আঙুলে আঙুলে কথা কইছে, কোনো কবিই এমন সহজ করে
কিছু লিখতে পারলে না।"

"কিছুই তোমার সহজে পছন্দ হয় না, সেইজন্যে তোমাকে এত
ভয় করি মিতা!"

"কিন্তু আমার কথাটা বুঝে দেখো। রামচন্দ্র সীতার সত্য যাচাই
করতে চেয়েছিলেন বাইরের আগুনে; তাতেই সীতাকে হারালেন।
কবিতার সত্য যাচাই হয় অগ্নিপরীক্ষায়, সে আগুন অন্তরের। যার
মনে নেই সেই আগুন সে যাচাই করবে কী দিয়ে। তাকে পাঁচজনের
মুখের কথা মেনে নিতে হয়, অনেক সময়ই সেটা দুর্মুখের কথা।
আমার মনে আজ আগুন জ্বলেছে, সেই আগুনের ভিতর দিয়ে
আমার পুরোনো সব পড়া আবার পড়ে নিচ্ছি, কত অল্পই
টিঁকল। সব হু হু শব্দে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কবিদের হট্টগোলের
মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ আমাকে বলতে হল, তোমরা অত চেঁচিয়ে
কথা কোয়ো না, ঠিক কথাটি আস্তে বলো--

"For Gods sake, hold your tongue
and let me love! "

অনেকক্ষণ দুজনে চুপ করে বসে রইল।

তার পরে এক সময়ে
লাবণ্যর হাতখানি তুলে ধরে অমিত নিজের মুখের উপর বুলিয়ে
নিলে। বললে, "ভেবে দেখো বন্যা, আজ এই সকালে ঠিক এই
মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবীতে কত অসংখ্য লোকই চাচ্ছে, আর কত
অল্প লোকই পেলে। আমি সেই অতি অল্প লোকের মধ্যে
একজন। সমস্ত পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই সেই সৌভাগ্যবান
লোককে দেখতে পেলে শিলঙ পাহাড়ের কোণে এই য়ুক্যালিপ্টস
গাছের তলায়। পৃথিবীতে পরমাশ্চর্য ব্যাপারগুলিই পরম নম্র,
চোখে পড়তে চায় না। অথচ তোমাদের ঐ তারিণী তলাপাত্র
কলকাতার গোলদিঘি থেকে আরম্ভ করে নোয়াখালি-চাটগাঁ
পর্যন্ত চীৎকার-শব্দে শূন্যের দিকে ঘুষি উঁচিয়ে বাঁকা
পলিটিক্সের ফাঁকা আওয়াজ ছড়িয়ে এল, সেই দুর্দান্ত বাজে
খবরটা বাংলাদেশের সর্বপ্রধান খবর হয়ে উঠল। কে জানে,
হয়তো এইটেই ভালো।"

"কোন্টা ভালো।"

"ভালো এই যে, সংসারের আসল জিনিসগুলো হাটেবাটেই
চলাফেরা করে বেড়ায়, অথচ বাজে লোকের চোখের ঠোকর খেয়ে
খেয়ে মরে না। তার গভীর জানাজানি বিশ্বজগতের অন্তরের
নাড়িতে নাড়িতে।-- আচ্ছা বন্যা, আমি তো বকেই চলেছি, তুমি
চুপ করে বসে কী ভাবছ বলো তো।"

লাবণ্য চোখ নিচু করে বসে রইল, জবাব করলে না।

অমিত বললে, "তোমার এই চুপ করে থাকা যেন মাইনে না দিয়ে
আমার সব কথাকে বরখাস্ত করে দেওয়ার মতো।"

লাবণ্য চোখ নিচু করেই বললে, "তোমার কথা শুনে আমার ভয়
হয় মিতা।"

"ভয় কিসের।"

"তুমি আমার কাছে কী যে চাও আর আমি তোমাকে কতটুকুই-বা
দিতে পারি ভেবে পাই নে।"

"কিছু না ভেবেই তুমি দিতে পার এইটেতেই তো তোমার দানের
দাম।"

"তুমি যখন বললে কর্তা-মা সম্মতি দিয়েছেন, আমার মনটা
কেমন করে উঠল। মনে হল, এইবার আমার ধরা পড়বার দিন
আসছে।"

"ধরাই তো পড়তে হবে।"

"মিতা, তোমার রুচি তোমার বুদ্ধি আমার অনেক উপরে।
তোমার সঙ্গে একত্রে পথ চলতে গিয়ে একদিন তোমার থেকে
বহুদূরে পিছিয়ে পড়ব, তখন আর তুমি আমাকে ফিরে ডাকবে না।
সেদিন আমি তোমাকে একটুও দোষ দেব না-- না না, কিছু
বোলো না, আমার কথাটা আগে শোনো। মিনতি করে বলছি,
আমাকে বিয়ে করতে চেয়ো না। বিয়ে করে তখন গ্রন্থি খুলতে
গেলে তাতে আরো জট পড়ে যাবে। তোমার কাছ থেকে আমি যা
পেয়েছি সে আমার পক্ষে যথেষ্ট, জীবনের শেষ পর্যন্ত চলবে।
তুমি কিন্তু নিজেকে ভুলিয়ো না।"

"বন্যা, তুমি আজকের দিনের ঔদার্যের মধ্যে কালকের দিনের
কার্পণ্যের আশঙ্কা কেন তুলছ।"

"মিতা, তুমিই আমাকে সত্য বলবার জোর দিয়েছ। আজ
তোমাকে যা বলছি তুমি নিজেও তা ভিতরে ভিতরে জান। মানতে
চাও না, পাছে যে রস এখন ভোগ করছ তাতে একটুও খটকা বাধে।
তুমি তো সংসার ফাঁদবার মানুষ নও, তুমি রুচির তৃষ্ণা মেটাবার
জন্য ফেরো; সাহিত্যে সাহিত্যে তাই তোমার বিহার, আমার
কাছেও সেইজন্যেই তুমি এসেছ। বলব ঠিক কথাটা? বিয়েটাকে
তুমি মনে মনে জান, যাকে তুমি সর্বদাই বল, ভাল্গার। ওটা
বড়ো রেস্পেক্টেবল্; ওটা শাস্ত্রের-দোহাই-পাড়া সেই-সব
বিষয়ী লোকের পোষা জিনিস যারা সম্পত্তির সঙ্গে
সহধর্মিণীকে মিলিয়ে নিয়ে খুব মোটা তাকিয়া ঠেসান দিয়ে
বসে।"

"বন্যা, তুমি আশ্চর্য নরম সুরে আশ্চর্য কঠিন কথা বলতে
পার।"

"মিতা, ভালোবাসার জোরে চিরদিন যেন কঠিন থাকতেই পারি,
তোমাকে ভোলাতে গিয়ে একটুও ফাঁকি যেন না দিই। তুমি যা
আছ ঠিক তাই থাকো, তোমার রুচিতে আমাকে যতটুকু ভালো
লাগে ততটুকুই লাগুক, কিন্তু একটুও তুমি দায়িত্ব নিয়ো না,
তাতেই আমি খুশি থাকব।"

"বন্যা, এবার তবে আমার কথাটা বলতে দাও। কী আশ্চর্য করেই
তুমি আমার চরিত্রের ব্যাখ্যা করেছ। তা নিয়ে কথা কাটাকাটি
করব না। কিন্তু একটা জায়গায় তোমার ভুল আছে। মানুষের
চরিত্র জিনিসটাও চলে। ঘর-পোষা অবস্থায় তার একরকম
শিকলি-বাঁধা স্থাবর পরিচয়। তার পরে একদিন ভাগ্যের হঠাৎ এক
ঘায়ে তার শিকলি কাটে, সে ছুট দেয় অরণ্যে, তখন তার আর-এক
মূর্তি।"

"আজ তুমি তার কোন্টা।"

"যেটা আমার বরাবরের সঙ্গে মেলে না, সেইটে। এর আগে অনেক
মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, সমাজের কাটা খাল বেয়ে
বাঁধা ঘাটে রুচির ঢাকা লণ্ঠন জ্বালিয়ে। তাতে দেখাশোনা হয়,
চেনাশোনা হয় না। তুমি নিজেই বলো বন্যা, তোমার সঙ্গেও
কি আমার সেই আলাপ।"

লাবণ্য চুপ করে রইল।
অমিত বললে, "বাইরে বাইরে দুই নক্ষত্র পরস্পরকে সেলাম
করতে করতে প্রদক্ষিণ করে চলে, কায়দাটা বেশ শোভন,
নিরাপদ, সেটাতে যেন তাদের রুচির টান, মর্মের মিল নয়। হঠাৎ
যদি মরণের ধাক্কা লাগে, নিবে যায় দুই তারার লণ্ঠন, দোঁহে
এক হয়ে ওঠবার আগুন ওঠে জ্বলে। সেই আগুন জ্বলেছে, অমিত
রায় বদলে গেল। মানুষের ইতিহাসটাই এইরকম। তাকে দেখে মনে
হয় ধারাবাহিক, কিন্তু আসলে সে আকস্মিকের মালা গাঁথা।
সৃষ্টির গতি চলে সেই আকস্মিকের ধাক্কায় ধাক্কায় দমকে
দমকে, যুগের পর যুগ এগিয়ে যায় ঝাঁপতালের লয়ে। তুমি আমার
তাল বদলিয়ে দিয়েছ বন্যা, সেই তালেই তো তোমার সুরে
আমার সুরে গাঁথা পড়ল।"

লাবণ্যর চোখের পাতা ভিজে এল। তবু এ কথা মনে না করে
থাকতে পারলে না যে, অমিতর মনের গড়নটা সাহিত্যিক,
প্রত্যেক অভিজ্ঞতায় ওর মুখে কথার উচ্ছ্বাস তোলে। সেইটে
ওর জীবনের ফসল, তাতেই ও পায় আনন্দ। আমাকে ওর
প্রয়োজন সেইজন্যেই। যে-সব কথা ওর মনে বরফ হয়ে জমে
আছে, ও নিজে যার ভার বোধ করে কিন্তু আওয়াজ পায় না,
আমার উত্তাপ লাগিয়ে তাকে গলিয়ে ঝরিয়ে দিতে হবে।

দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে লাবণ্য হঠাৎ এক সময়ে
প্রশ্ন করলে, "আচ্ছা মিতা, তুমি কি মনে কর না, যেদিন
তাজমহল তৈরি শেষ হল সেদিন মমতাজের মৃত্যুর জন্যে
শাজাহান খুশি হয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নকে অমর করবার জন্যে
এই মৃত্যুর দরকার ছিল। এই মৃত্যুই মমতাজের সব চেয়ে বড়ো
প্রেমের দান। তাজমহলে শাজাহানের শোক প্রকাশ পায় নি,
তাঁর আনন্দ রূপ ধরেছে।"

অমিত বললে, "তোমার কথায় তুমি ক্ষণে ক্ষণে আমাকে চমক
লাগিয়ে দিচ্ছ। তুমি নিশ্চয়ই কবি।"

"আমি চাই নে কবি হতে।"

"কেন চাও না।"

"জীবনের উত্তাপে কেবল কথার প্রদীপ জ্বালাতে আমার মন যায়
না। জগতে যারা উৎসবসভা সাজাবার হুকুম পেয়েছে কথা তাদের
পক্ষেই ভালো। আমার জীবনের তাপ জীবনের কাজের জন্যেই।"

"বন্যা, তুমি কথাকে অস্বীকার করছ? জান না, তোমার কথা
আমাকে কেমন করে জাগিয়ে দেয়। তুমি কী করে জানবে তুমি কী
বল, আর সে বলার কী অর্থ। আবার দেখছি নিবারণ চক্রবর্তীকে
ডাকতে হল। ওর নাম শুনে শুনে তুমি বিরক্ত হয়ে গেছ। কিন্তু
কী করব বলো, ঐ লোকটা আমার মনের কথার ভাণ্ডারী।
নিবারণ এখনো নিজের কাছে নিজে পুরোনো হয়ে যায় নি; ও
প্রত্যেক বারেই যে কবিতা লেখে সে ওর প্রথম কবিতা। সেদিন
ওর খাতা ঘাঁটতে ঘাঁটতে অল্পদিন আগেকার একটা লেখা পাওয়া
গেল। ঝরনার উপরে কবিতা-- কী করে খবর পেয়েছে শিলঙ
পাহাড়ে এসে আমার ঝরনা আমি খুঁজে পেয়েছি। ও লিখছে--

"ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
স্বচ্ছ ধারা--
তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
সূর্য তারা।

"আমি নিজে যদি লিখতুম, এর চেয়ে স্পষ্টতর করে তোমার
বর্ণনা করতে পারতুম না। তোমার মনের মধ্যে এমন একটি
স্বচ্ছতা আছে যে, আকাশের সমস্ত আলো সহজেই
প্রতিবিম্বিত হয়। তোমার সব-কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে-পড়া সেই
আলো আমি দেখতে পাই-- তোমার মুখে, তোমার হাসিতে,
তোমার কথায়, তোমার স্থির হয়ে বসে থাকায়, তোমার রাস্তা
দিয়ে চলায়।

"আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
কলধ্বনি--
দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার
চিরন্তনী।

"তুমি ঝরনা, জীবনস্রোতে তুমি যে কেবল চলছ তা নয়, তোমার
চলার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার বলা। সংসারের যে-সব কঠিন অচল
পাথরগুলোর উপর দিয়ে চল তারাও তোমার সংঘাতে সুরে বেজে
ওঠে।

               "আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
                         মিলিত ছবি,
               তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
                         মেতেছে কবি।
               পদে পদে তব আলোর ঝলকে
               ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
               মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
                         নির্ঝরিণী।
               তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
                         নিজেরে চিনি।"

লাবণ্য একটু ম্লান হাসি হেসে বললে,

"যতই আমার আলো
থাক্ আর ধ্বনি থাক্, তোমার ছায়া তবু ছায়াই, সে ছায়াকে আমি
ধরে রাখতে পারব না।"

অমিত বললে, "কিন্তু একদিন হয়তো দেখবে, আর কিছু যদি না
থাকে, আমার বাণীরূপ রয়েছে।"

লাবণ্য হেসে বললে, "কোথায়। নিবারণ চক্রবর্তীর খাতায়?"

"আশ্চর্য কিছুই নেই। আমার মনের নীচের স্তরে যে ধারা বয়,
নিবারণের ফোয়ারায় কেমন করে সেটা বেরিয়ে আসে।"

"তা হলে কোনো-একদিন হয়তো কেবল নিবারণ চক্রবর্তীর
ফোয়ারার মধ্যেই তোমার মনটিকে পাব, আর কোথাও নয়।"

এমন সময় বাসা থেকে লোক এল ডাকতে-- খাবার তৈরি।
অমিত চলতে চলতে ভাবতে লাগল যে, "লাবণ্য বুদ্ধির আলোতে
সমস্তই স্পষ্ট করে জানতে চায়। মানুষ স্বভাবত যেখানে
আপনাকে ভোলাতে ইচ্ছা করে ও সেখানেও নিজেকে ভোলাতে
পারে না। লাবণ্য যে কথাটা বললে সেটার তো প্রতিবাদ করতে
পারছি নে। অন্তরাত্মার গভীর উপলব্ধি বাইরে প্রকাশ করতেই
হয়-- কেউ-বা করে জীবনে, কেউ-বা করে রচনায়-- জীবনকে ছুঁতে
ছুঁতে, অথচ তার থেকে সরতে সরতে নদী যেমন কেবলই তীর থেকে
সরতে সরতে চলে, তেমনি। আমি কি কেবলই রচনার স্রোত
নিয়েই জীবন থেকে সরে সরে যাব। এইখানেই কি মেয়েপুরুষের
ভেদ। পুরুষ তার সমস্ত শক্তিকে সার্থক করে সৃষ্টি করতে, সেই
সৃষ্টি আপনাকে এগিয়ে দেবার জন্যেই আপনাকে পদে পদে
ভোলে। মেয়ে তার সমস্ত শক্তিকে খাটায় রক্ষা করতে,
পুরোনোকে রক্ষা করবার জন্যেই নতুন সৃষ্টিকে সে বাধা দেয়।
রক্ষার প্রতি সৃষ্টি নিষ্ঠুর, সৃষ্টির প্রতি রক্ষা বিঘ্ন। এমন
কেন হল। এক জায়গায় এরা পরস্পরকে আঘাত করবেই। যেখানে
খুব ক'রে মিল সেইখানেই মস্ত বিরুদ্ধতা। তাই ভাবছি, আমাদের
সকলের চেয়ে বড়ো যে পাওনা সে মিলন নয়, সে মুক্তি।'
এ কথাটা ভাবতে অমিতকে পীড়া দিলে, কিন্তু ওর মন এটাকে
অস্বীকার করতে পারলে না।
-
ব্যালাব্রুয়ি, ব্যাঙ্গালোর, ২৫ জুন ১৯২৮

Sunday, July 3, 2016

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-৯)

শেষের কবিতা (পর্ব-৯)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
অমিত মিশুক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে তার বেশিক্ষণ
চলে না। সর্বদাই নিজে বকা-ঝকা করা অভ্যাস। গাছপালা-
পাহাড়পর্বতের সঙ্গে হাসিতামাশা চলে না, তাদের সঙ্গে
কোনোরকম উলটো ব্যবহার করতে গেলেই ঘা খেয়ে মরতে
হয়; তারাও চলে নিয়মে, অন্যের ব্যবহারেও তারা নিয়ম
প্রত্যাশা করে; এক কথায়, তারা অরসিক, সেইজন্যে শহরের
বাইরে ওর প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।

কিন্তু হঠাৎ কী হল, শিলং পাহাড়টা চার দিক থেকে অমিতকে
নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য
ওঠবার আগেই; এটা ওর স্বধর্মবিরুদ্ধ। জানলা দিয়ে দেখলে,
দেবদারু গাছের ঝালরগুলো কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা
মেঘের উপর পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা
লম্বা সোনালি টান লাগিয়েছে--আগুনে-জ্বলা যে-সব রঙের
আভা ফুটে উঠছে তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর
কোনো উপায় নেই।

তাড়াতাড়ি এক পেয়ালা চা খেয়ে অমিত বেরিয়ে পড়ল। রাস্তা
তখন নির্জন। একটা শ্যাওলাধরা অতি প্রাচীন পাইন গাছের
তলায় স্তরে স্তরে ঝরা-পাতার সুগন্ধ-ঘন আস্তরণের উপর
পা ছড়িয়ে বসল। সিগারেট জ্বালিয়ে দুই আঙুলে অনেকক্ষণ
চেপে রেখে দিলে, টান দিতে গেল ভুলে।

যোগমায়ার বাড়ির পথে এই বন। ভোজে বসবার পূর্বে
রান্নাঘরটা থেকে যেমন আগাম গন্ধ পাওয়া যায়, এই জায়গা
থেকে যোগমায়ার বাড়ির সৌরভটা অমিত সেইরকম ভোগ
করে। সময়টা ঘড়ির ভদ্র দাগটাতে এসে পৌঁছলেই সেখানে
গিয়ে এক পেয়ালা চা দাবি করবে। প্রথমে সেখানে ওর যাবার
সময় নির্দিষ্ট ছিল সন্ধেবেলায়। অমিত সাহিত্যরসিক, এই
খ্যাতিটার সুযোগে আলাপ-আলোচনার জন্যে ও পেয়েছিল
বাঁধা নিমন্ত্রণ। প্রথম দুই-চারি দিন যোগমায়া এই
আলোচনায় উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু যোগমায়ার
কাছে ধরা পড়ল যে, তাতে করেই এ পক্ষের উৎসাহটাকে কিছু
যেন কুণ্ঠিত করলে। বোঝা শক্ত নয় যে, তার কারণ
দ্বিবচনের জায়গায় বহুবচন প্রয়োগ। তার পর থেকে
যোগমায়ার অনুপস্থিত থাকবার উপলক্ষ ঘন ঘন ঘটত। একটু
বিশ্লেষণ করতেই বোঝা গেল, সেগুলি অনিবার্য নয়, দৈবকৃত
নয়, তাঁর ইচ্ছাকৃত। প্রমাণ হল, কর্তামা এই দুটি
আলোচনাপরায়ণের যে অনুরাগ লক্ষ্য করেছেন সেটা
সাহিত্যানুরাগের চেয়ে বিশেষ একটু গাঢ়তর। অমিত বুঝে নিলে
যে, মাসির বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ম, অথচ
মনটি আছে কোমল। এতে করেই আলোচনার উৎসাহ তার
আরো প্রবল হল। নির্দিষ্ট কালটাকে প্রশস্ততর করবার
অভিপ্রায়ে যতিশংকরের সঙ্গে আপসে ব্যবস্থা করলে, তাকে
সকালে এক ঘণ্টা এবং বিকেলে দু ঘণ্টা ইংরেজি সাহিত্য
পড়ায় সাহায্য করবে। শুরু করলে সাহায্য-- এত
বাহুল্যপরিমাণে যে, প্রায়ই সকাল গড়াত দুপুরে, সাহায্য
গড়াত বাজে কথায়, অবশেষে যোগমায়ার এবং ভদ্রতার
অনুরোধে মধ্যাহ্নভোজনটা অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ত। এমনি
করে দেখা গেল অবশ্যকর্তব্যতার পরিধি প্রহরে প্রহরে
বেড়েই চলে।

যতিশংকরের অধ্যাপনায় ওর যোগ দেবার কথা সকাল
আটটায়। ওর প্রকৃতিস্থ অবস্থায় সেটা ছিল অসময়। ও
বলত, যে জীবের গর্ভবাসের মেয়াদ দশ মাস তার ঘুমের
মেয়াদ পশুপক্ষীদের মাপে সংগত হয় না। এতদিন অমিতর
রাত্রিবেলাটা তার সকলাবেলাকার অনেকগুলো ঘণ্টাকে
পিলপেগাড়ি করে নিয়েছিল। ও বলত, এই চোরাই সময়টা
অবৈধ বলেই ঘুমের পক্ষে সব চেয়ে অনুকূল।

কিন্তু আজকাল ওর ঘুমটা আর অবিমিশ্র নয়। সকাল সকাল
জাগবার একটা আগ্রহ তার অন্তর্নিহিত। প্রয়োজনের
আগেই ঘুম ভাঙে-- তার পরে পাশ ফিরে শুতে সাহস হয় না,
পাছে বেলা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দিয়েছে;
কিন্তু সময় চুরির অপরাধ ধরা পড়বার ভয়ে সেটা বার বার করা
সম্ভব হত না। আজ একবার ঘড়ির দিকে চাইলে, দেখলে,
বেলা এখনো সাতটার এ পারেই। মনে হল, ঘড়ি নিশ্চয় বন্ধ।
কানের কাছে নিয়ে শুনলে টিকটিক শব্দ।

এমন সময় চমকে উঠে দেখে, ডান হাতে ছাতা দোলাতে
দোলাতে উপরের রাস্তা দিয়ে আসছে লাবণ্য। সাদা শাড়ি,
পিঠে কালো রঙের তিনকোণা শাল, তাতে কালো ঝালর।
অমিতর বুঝতে বাকি নেই যে, লাবণ্যর অর্ধেক দৃষ্টিতে সে
গোচর হয়েছে, কিন্তু পূর্ণদৃষ্টিতে সেটাকে মোকাবিলায় কবুল
করতে লাবণ্য নারাজ। বাঁকের মুখ পর্যন্ত লাবণ্য যেই গেছে,
অমিত আর থাকতে পারলে না, দৌড়তে দৌড়তে তার পাশে
উপস্থিত।

বললে, "জানতেন এড়াতে পারবেন না, তবু দৌড় করিয়ে
নিলেন। জানেন না কি, দূরে চলে গেলে কতটা অসুবিধা হয়।"

"কিসের অসুবিধা।"

অমিত বললে, "যে হতভাগা পিছনে পড়ে থাকে তার প্রাণটা
ঊর্ধ্বস্বরে ডাকতে চায়। কিন্তু ডাকি কী বলে। দেবদেবীদের
নিয়ে সুবিধে এই যে, নাম ধরে ডাকলেই তাঁরা খুশি। দুর্গা
দুর্গা বলে গর্জন করতে থাকলেও ভগবতী দশভুজা অসন্তুষ্ট
হন না। আপনাদের নিয়ে যে মুশকিল।"

"না ডাকলেই চুকে যায়।"

"বিনা সম্বোধনেই চালাই যখন কাছে থাকেন। তাই তো বলি,
দূরে যাবেন না। ডাকতে চাই অথচ ডাকতে পারি নে, এর চেয়ে
দুঃখ আর নেই।"

"কেন, বিলিতি কায়দা তো আপনার অভ্যাস আছে।"

"মিস ডাট? সেটা চায়ের টেবিলে। দেখুন-না, আজ এই
আকাশের সঙ্গে পৃথিবী যখন সকালের আলোয় মিলল, সেই
মিলনের লগ্নটি সার্থক করবার জন্যে উভয়ে মিলে একটি রূপ
সৃষ্টি করলে, তারই মধ্যে রয়ে গেল স্বর্গমর্তের ডাকনাম।
মনে হচ্ছে না কি, একটা নাম ধরে ডাকা উপর থেকে নীচে
আসছে, নীচে থেকে উপরে উঠে চলেছে। মানুষের জীবনেও কি
ঐ রকমের নাম সৃষ্টি করবার সময় উপস্থিত হয় না। কল্পনা
করুন-না, যেন এখনই প্রাণ খুলে গলা ছেড়ে আপনাকে ডাক
দিয়েছি, নামের ডাক বনে বনে ধ্বনিত হল, আকাশের ঐ রঙিন
মেঘের কাছ পর্যন্ত পৌঁছল, সামনের ঐ পাহাড়টা তাই শুনে
মাথায় মেঘ মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। মনে ভাবতেও
কি পারেন সেই ডাকটা মিস ডাট।"

লাবণ্য কথাটাকে এড়িয়ে বললে, "নামকরণে সময় লাগে,
আপাতত বেড়িয়ে আসি গে।"

অমিত তার সঙ্গ নিয়ে বললে, "চলতে শিখতেই মানুষের দেরি
হয়, আমার হল উলটো। এতদিন পরে এখানে এসে তবে
বসতে শিখেছি। ইংরেজিতে বলে, গড়ানে পাথরের কপালে
শ্যাওলা জোটে না-- সেই ভেবেই অন্ধকার থাকতে কখন
থেকে পথের ধারে বসে আছি। তাই তো ভোরের আলো
দেখলুম।"

লাবণ্য কথাটাকে তাড়াতাড়ি চাপা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, "ঐ
সবুজ ডানাওয়ালা পাখিটার নাম জানেন?"

অমিত বললে, "জীবজগতে পাখি আছে সেটা এতদিন
সাধারণভাবেই জানতুম, বিশেষভাবে জানবার সময় পাই নি।
এখানে এসে, আশ্চর্য এই যে, স্পষ্ট জানতে পেরেছি, পাখি
আছে, এমন-কি, তারা গানও গায়।"

লাবণ্য হেসে উঠে বললে, "আশ্চর্য!"

অমিত বললে, "হাসছেন! আমার গভীর কথাতেও গাম্ভীর্য
রাখতে পারি নে। ওটা মুদ্রাদোষ। আমার জন্মলগ্নে আছে
চাঁদ, ঐ গ্রহটি কৃষ্ণচতুর্দশীর সর্বনাশা রাত্রেও একটুখানি
মুচকে না হেসে মরতেও জানে না।"

লাবণ্য বললে, "আমাকে দোষ দেবেন না। বোধ হয় পাখিও
যদি আপনার কথা শুনত, হেসে উঠত।"

অমিত বললে, "দেখুন, আমার কথা লোকে হঠাৎ বুঝতে পারে
না বলেই হাসে, বুঝতে পারলে চুপ করে বসে ভাবত। আজ
পাখিকে নতুন করে জানছি এ কথায় লোকে হাসছে। কিন্তু এর
ভিতরের কথাটা হচ্ছে এই যে, আজ সমস্তই নতুন করে
জানছি, নিজেকেও। এর উপরে তো হাসি চলে না। ঐ দেখুন-
না, কথাটা একই, অথচ এইবার আপনি একেবারেই চুপ।"

লাবণ্য হেসে বললে, "আপনি তো বেশিদিনের মানুষ না, খুবই
নতুন, আরো নতুনের ঝোঁক আপনার মধ্যে আসে কোথা
থেকে।"

"এর জবাবে খুব-একটা গম্ভীর কথাই বলতে হল যা চায়ের
টেবিলে বলা চলে না। আমার মধ্যে নতুন যেটা এসেছে সেটাই
অনাদিকালের পুরোনো, ভোরবেলাকার আলোর মতোই সে
পুরোনো, নতুন-ফোটা ভুইচাঁপা ফুলেরই মতো, চিরকালের
জিনিস নতুন করে আবিষ্কার।"

কিছু না বলে লাবণ্য হাসলে।

অমিত বললে, "আপনার এবারকার এই হাসিটি পাহারাওয়ালার
চোর-ধরা গোল লণ্ঠনের হাসি। বুঝেছি, আপনি যে কবির
ভক্ত তার বই থেকে আমার মুখের এ কথাটা আগেই পড়ে
নিয়েছেন। দোহাই আপনার, আমাকে দাগি চোর ঠাওরাবেন না।
এক এক সময়ে এমন অবস্থা আসে, মনের ভিতরটা
শংকরাচার্য হয়ে ওঠে; বলতে থাকে, আমিই লিখেছি কি আর
কেউ লিখেছে এই ভেদজ্ঞানটা মায়া। এই দেখুন-না, আজ
সকালে বসে হঠাৎ খেয়াল গেল, আমার জানা সাহিত্যের ভিতর
থেকে এমন একটা লাইন বের করি যেটা মনে হবে এইমাত্র
স্বয়ং আমি লিখলুম, আর কোনো কবির লেখবার সাধ্যই ছিল
না।"

লাবণ্য থাকতে পারলে না, প্রশ্ন করলে, "বের করতে
পেরেছেন?"

"হাঁ, পেরেছি।"

লাবণ্যর কৌতূহল আর বাধা মানল না, জিজ্ঞাসা করে
ফেললে, "লাইনটা কী বলুন-না।"

"For Gods sake, hold your tongue
and let me love! "

লাবণ্যর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

অনেকক্ষণ পরে অমিত জিজ্ঞাসা করলে, "আপনি নিশ্চয়
জানেন লাইনটা কার।"

লাবণ্য একটু মাথা বেঁকিয়ে ইশারায় জানিয়ে দিলে, হাঁ।

অমিত বললে, "সেদিন আপনার টেবিলে ইংরেজ কবি ডনের বই
আবিষ্কার করলুম, নইলে এ লাইন আমার মাথায় আসত না।"

"আবিষ্কার করলেন?"

"আবিষ্কার নয় তো কী। বইয়ের দোকানে বই চোখে পড়ে,
আপনার টেবিলে বই প্রকাশ পায়। পাব্লিক লাইব্রেরির টেবিল
দেখেছি, সেটা তো বইগুলিকে বহন করে; আপনার টেবিল
দেখলুম, সে যে বইগুলিকে বাসা দিয়েছে। সেদিন ডনের
কবিতাকে প্রাণ দিয়ে দেখতে পেয়েছি। মনে হল, অন্য কবির
দরজায় ঠেলাঠেলি ভিড়, বড়োলোকের শ্রাদ্ধে কাঙালি-বিদায়ের
মতো। ডনের কাব্যমহল নির্জন, ওখানে দুটি মানুষ পাশাপাশি
বসবার জায়গাটুকু আছে। তাই অমন স্পষ্ট করে শুনতে পেলুম
আমার সকালবেলাকার মনের কথাটি--

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্।
ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"

লাবণ্য বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, "আপনি বাংলা কবিতা
লেখেন নাকি।"

"ভয় হচ্ছে, আজ থেকে লিখতে শুরু করব-বা। নতুন অমিত
রায় কী-যে কাণ্ড করে বসবে, পুরোনো অমিত রায়ের তা কিছু
জানা নেই। হয়তো-বা সে এখনই লড়াই করতে বেরোবে।"

"লড়াই? কার সঙ্গে।"

"সেইটে ঠিক করতে পারছি নে। কেবলই মনে হচ্ছে, খুব
মস্ত কিছু একটার জন্যে এক্খুনি চোখ বুঝে প্রাণ দিয়ে ফেলা
উচিত, তার পরে অনুতাপ করতে হয় রয়ে বসে করা যাবে।"

লাবণ্য হেসে বললে, "প্রাণ যদি দিতেই হয় তো সাবধানে
দেবেন।"

"সে কথা আমাকে বলা অনাবশ্যক। কম্যুন্যাল রায়টের মধ্যে
আমি যেতে নারাজ। মুসলমান বাঁচিয়ে, ইংরেজ বাঁচিয়ে চলব।
যদি দেশি বুড়োসুড়ো গোছের মানুষ, অহিংস্র মেজাজের
ধার্মিক চেহারা, শিঙে বাজিয়ে মোটর হাঁকিয়ে চলেছে, তার
সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকিয়ে বলব "যুদ্ধং দেহি'-- ঐ যে-
লোক অজীর্ণ রোগ সারবার জন্যে হাসপাতালে না গিয়ে এমন
পাহাড়ে আসে, খিদে বাড়াবার জন্যে নির্লজ্জ হয়ে হাওয়া
খেতে বেরোয়।"

লাবণ্য হেসে বললে, "লোকটা তবু যদি অমান্য করে চলে
যায়?"

"তখন আমি পিছন থেকে দু হাত আকাশে তুলে বলব,
এবারকার মতো ক্ষমা করলুম, তুমি আমার ভ্রাতা, আমরা
এক ভারতমাতার সন্তান।-- বুঝতে পারছেন, মন যখন খুব
বড়ো হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।"

লাবণ্য হেসে বললে, "আপনি যখন যুদ্ধের প্রস্তাব
করেছিলেন মনে ভয় হয়েছিল, কিন্তু ক্ষমার কথা যেরকম
বোঝালেন তাতে আশ্বস্ত হলুম যে ভাবনা নেই।"

অমিত বললে, "আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?"

"কী, বলুন।"

"আজ খিদে বাড়াবার জন্যে আর বেশি বেড়াবেন না।"

"আচ্ছা, বেশ, তার পরে?"

"ঐ নীচে গাছতলায় যেখানে নানা রঙের ছ্যাতলা পড়া পাথরটার
নীচে দিয়ে একটুখানি জল ঝির্ঝির্ করে বয়ে যাচ্ছে ঐখানে
বসবেন আসুন।"

লাবণ্য হাতে-বাঁধা ঘড়িটার দিকে চেয়ে বললে, "কিন্তু সময়
যে অল্প।"

"জীবনে সেইটেই তো শোচনীয় সমস্যা, লাবণ্যদেবী, সময়
অল্প। মরুপথে সঙ্গে আছে আধ-মশক মাত্র জল। যাতে
সেটা উছলে উছলে শুকনো ধুলোয় মারা না যায় সেটা নিতান্তই
করা চাই। সময় যাদের বিস্তর তাদেরই পাঙ্ক্চুয়াল হওয়া
শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম তাই ঠিক সময়টিতে
সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প,
পাঙ্ক্চুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে
অমিতব্যয়িতা। অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে "ভবে এসে
করলে কী' তখন কোন্ লজ্জায় বলব, "ঘড়ির কাঁটার দিকে
চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের
অতীত তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি।' তাই তো
বলতে বাধ্য হলুম, চলুন ঐ জায়গাটাতে।"

ওর যেটাতে আপত্তি নেই সেটাতে আর কারো যে আপত্তি
থাকতে পারে অমিত সেই আশঙ্কাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে
কথাবার্তা কয়। সেইজন্যে তার প্রস্তাবে আপত্তি করা
শক্ত। লাবণ্য বললে, "চলুন।"

ঘনবনের ছায়া। সরু পথ নেমেছে নীচে একটা খাসিয়া গ্রামের
দিকে। অর্ধপথে আর-এক পাশ দিয়ে ক্ষীণ ঝরনার ধারা এক
জায়গায় লোকালয়ের পথটাকে অস্বীকার করে তার উপর দিয়ে
নিজের অধিকারচিহ্নস্বরূপ নুড়ি বিছিয়ে স্বতন্ত্র পথ চালিয়ে
গেছে। সেইখানে পাথরের উপরে দুজনে বসল। ঠিক সেই
জায়গায় খাদটা গভীর হয়ে খানিকটা জল জমে আছে, যেন
সবুজ পর্দার ছায়ায় একটি পর্দানশীন মেয়ে, বাইরে পা
বাড়াতে তার ভয়। এখানকার নির্জনতার আবরণটাই লাবণ্যকে
নিরাবরণের মতো লজ্জা দিতে লাগল। সামান্য যা তা একটা
কিছু বলে এইটেকে ঢাকা দিতে ইচ্ছে করছে, কিছুতেই কোনো
কথা মনে আসছে না, স্বপ্নে যেরকম কণ্ঠরোধ হয় সেই
দশা।

অমিত বুঝতে পারলে, একটা-কিছু বলাই চাই। বললে, "দেখুন
আর্যা, আমাদের দেশে দুটো ভাষা-- একটা সাধু, আর-একটা
চলতি। কিন্তু এ ছাড়া আরো একটা ভাষা থাকা উচিত ছিল--
সমাজের ভাষা নয়, ব্যবসায়ের ভাষা নয়, আড়ালের ভাষা
এইরকম জায়গার জন্য। পাখির গানের মতো, কবির কাব্যের
মতো সেই ভাষা অনায়াসেই কণ্ঠ দিয়ে বেরোনো উচিত ছিল,
যেমন করে কান্না বেরোয়। সেজন্যে মানুষকে বইয়ের
দোকানে ছুটতে হয় সেটা বড়ো লজ্জা। প্রত্যেকবার হাসির
জন্যে যদি ডেণ্টিস্টের দোকানে দৌড়াদৌড়ি করতে হত তা
হলে কী হত ভেবে দেখুন। সত্যি বলুন লাবণ্যদেবী, এখনই
আপনার সুর করে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?"

লাবণ্য মাথা হেঁট করে চুপ করে বসে রইল।

অমিত বললে, "চায়ের টেবিলের ভাষায় কোন্টা ভদ্র, কোন্টা
অভদ্র, তার হিসেব মিটতে চায় না। কিন্তু এ জায়গায় ভদ্রও
নেই অভদ্রও নেই। তা হলে কী উপায় বলুন। মনটাকে সহজ
করবার জন্যে একটা কবিতা না আওড়ালে তো চলছে না।
গদ্যে অনেক সময় নেয়, অত সময় তো হাতে নেই। যদি
অনুমতি করেন তো আরম্ভ করি।"

দিতে হল অনুমতি, নইলে লজ্জা করতে গেলেই লজ্জা।

অমিত ভূমিকায় বললে, "রবি ঠাকুরের কবিতা বোধ হয়
আপনার ভালো লাগে।"

"হাঁ, লাগে।"

"আমার লাগে না। অতএব আমাকে মাপ করবেন। আমার
একজন বিশেষ কবি আছে; তার লেখা এত ভালো যে, খুব
অল্প লোকেই পড়ে। এমন-কি, তাকে কেউ গাল দেবার
উপযুক্ত সম্মানও দেয় না। ইচ্ছে করছি আমি তার থেকে
আবৃত্তি করি।"

"আপনি এত ভয় করছেন কেন।"

"এ সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা শোকাবহ। কবিবরকে নিন্দে
করলে আপনারা জাতে ঠেলেন, তাকে নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে
বাদ দিয়ে চললে তাতে করেও কঠোর ভাষার সৃষ্টি হয়। যা
আমার ভালো লাগে তাই আর-একজনের ভালো লাগে না, এই
নিয়েই পৃথিবীতে যত রক্তপাত।"

"আমার কাছ থেকে রক্তপাতের ভয় করবেন না। আপন রুচির
জন্যে আমি পরের রুচির সমর্থন ভিক্ষে করি নে।"

"এটা বেশ বলেছেন, তা হলে নির্ভয়ে শুরু করা যাক--

রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?

বিষয়টা দেখছেন? না-চেনার বন্ধন। সব চেয়ে কড়া বন্ধন।
না-চেনা জগতে বন্দী হয়েছি, চিনে নিয়ে তবে খালাস পাব,
একেই বলে মুক্তিতত্ত্ব।

কোন্ অন্ধক্ষণে
বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
মুখ দেখিলাম তোর।
চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।

নিজেকেই ভুলে থাকার মতো কোনো এমন ঝাপসা কোণ আর
নেই। সংসারে কত যে দেখবার ধন দেখা হল না, তারা
আত্মবিস্মৃতির কোণে মিলিয়ে আছে। তাই বলে তো হাল
ছেড়ে দিলে চলে না।

তোর সাথে চেনা
সহজে হবে না--
কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
করে নেব জয়
সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
দৃপ্ত বলে লব টানি
শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
নির্দয় আলোতে।

একেবারে নাছোড়বান্দা। কতবড়ো জোর। দেখেছেন রচনার
পৌরুষ।

                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।

ঠিক এই তানটি আপনার নামজাদা লেখকের মধ্যে পাবেন না,
সূর্যমণ্ডলে এ যেন আগুনের ঝড়। এ শুধু লিরিক নয়, এ
নিষ্ঠুর জীবনতত্ত্ব।"-- লাবণ্যর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে
চেয়ে বললে--

"হে অচেনা,
দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
তীব্র আকস্মিক
বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"

আবৃত্তি শেষ হতে-না-হতেই অমিত লাবণ্যর হাত চেপে
ধরলে। লাবণ্য হাত ছাড়িয়ে নিলে না। অমিতর মুখের দিকে
চাইলে, কিছু বললে না।

এর পরে কোনো কথা বলবার কোনো দরকার হল না। লাবণ্য
ঘড়ির দিকে চাইতেও ভুলে গেল।
-